গুণিজন সম্মাননায় শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক দুই তারকা দেলোয়ার ও তারেক

স্টাফ রিপোর্টার:
সংস্কৃতি মানে আলোর সাধনা, সমাজে মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। সেই আলো ছড়াচ্ছেন শ্রীমঙ্গলের দুই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব— নাট্যজন দেলোয়ার হোসেন ও কণ্ঠশিল্পী মো. তারেক ইকবাল চৌধুরী। সংস্কৃতিচর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি জেলা শিল্পকলা একাডেমি তাঁদেরকে গুণিজন সম্মাননা প্রদান করেছে।
১৯৭৯ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিরাজনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন নাট্যজন দেলোয়ার হোসেন। পিতা মো. আব্দুল হেকিম ও মাতা হালিমা বেগমের সন্তান দেলোয়ার ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী ছিলেন। ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএ সম্পন্ন করে তিনি সিলেটের মুরারিচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন।
ছাত্রাবস্থায়ই নাটকের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যসংগঠন ‘বিজয়ী থিয়েটার’। এখন তিনি সংগঠনটির সভাপতি। নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবে তাঁর লেখা ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে বহু দর্শকপ্রিয় নাটক— মহাজনের খেলা, তিনখান কথা, আশরাফুল মাখলুকাত, ঘটক সম্প্রদায়, একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন, মায়ের সমাধি ও বধ্যভূমি ৭১।
তাঁর নাটকে সমাজের বাস্তব চিত্র, মানবিক টানাপোড়েন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জীবন্ত হয়ে ওঠে। সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, জেলা নাট্য পরিষদ, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতি আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা মহামারির সময়ে তিনি অসহায় শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, শিশুদের জন্য মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করেছেন এবং তরুণদের মাদকমুক্ত জীবনের পথে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
অন্যদিকে, সংগীতের জগতে সমানভাবে আলো ছড়াচ্ছেন শ্রীমঙ্গলের কণ্ঠশিল্পী মো. তারেক ইকবাল চৌধুরী। তিনি বর্তমানে হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি যুক্ত আছেন শ্রীমঙ্গল শিল্পী কল্যাণ সংস্থা, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, সম্মিলিত নৃত্য পরিষদ ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে। এসব সংগঠনে সভাপতি ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তাঁর কণ্ঠে সুর মিশে থাকে আবেগ, দেশপ্রেম ও মানবতার বার্তা। জাতীয় দিবস ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাঁর পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। গুণিজন সম্মাননা পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন—
“কৃতজ্ঞতা রইল জুরি বোর্ড ও বাছাই কমিটির প্রতি। আমার মতো নগণ্য একজন শিল্পীকে গুণী শিল্পী হিসাবে মনোনীত করায় আজ থেকে মনে হয় দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল।”
তাঁর এই বিনয় প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন গায়ক নন— একজন নিবেদিত সাংস্কৃতিক মানুষ।
শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, জেলা শিল্পকলা একাডেমির এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়— এটি শ্রীমঙ্গলের সমগ্র সংস্কৃতি অঙ্গনের গৌরব। নাট্যকলার মঞ্চে দেলোয়ার হোসেন যেমন আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন, তেমনি সংগীতের সুরে হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছেন তারেক ইকবাল চৌধুরী। তাঁদের সম্মাননা প্রমাণ করে— শিল্পের শক্তি এখনো জীবন্ত, আর শ্রীমঙ্গল আজও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি।















