বিজয় দিবসে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী পিঠা উৎসব

স্টাফ রিপোর্টার, ভয়েস অব শ্রীমঙ্গল:
বাঙালি সংস্কৃতিতে শীত ঋতুর রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। পৌষ ও মাঘ মাস এলেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা স্বাদের পিঠা। এই পিঠাই বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালি সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং মহান বিজয় দিবসের আনন্দ শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দারুন্নাজাত ক্বওমী মাদরাসার নুরানী বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ‘পিঠা উৎসব–২০২৫’।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী পিঠা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। যান্ত্রিক জীবনে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম অনেক পিঠার নামই জানে না। হারিয়ে যেতে বসা লোকজ খাবার সংরক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এসব ঐতিহ্যের পরিচয় করিয়ে দিতেই এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়।
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) মাদরাসা ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী এ পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত উৎসবে বিজয় দিবস উপলক্ষে পরিবেশিত হয় দেশাত্মবোধক গজল, হামদ ও নাত। পাশাপাশি বিভিন্ন খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক আয়োজন শিক্ষার্থীদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
উৎসবে মোট ১০টি স্টলে ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা, লবঙ্গ পিঠা, কলা পিঠা, মালপোয়া সহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা প্রদর্শন ও পরিবেশন করা হয়। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত উৎসব চলে। এতে আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক ও অতিথিরা অংশগ্রহণ করেন। পুরো মাদরাসা ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশ।
ব্যতিক্রমী এ আয়োজনের প্রধান উদ্যোক্তা দারুন্নাজাত ক্বওমী মাদরাসার নুরানী বিভাগের প্রধান মাওলানা জাহিদ হাসান বলেন, “শীতের মৌসুমে পিঠা খাওয়ার আনন্দ আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ সময় মাদরাসায় অবস্থান করায় বাড়ির এ আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই তাদের শীতের আনন্দ ভাগাভাগি করতেই এই আয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “পিঠা আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্কুল-কলেজে পিঠা উৎসব হলেও কওমী মাদরাসায় এমন আয়োজন খুব কম দেখা যায়। আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি—কওমী মাদরাসাগুলোও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় পিছিয়ে নেই।”
মাদরাসার পরিচালক মাওলানা সাকালাইন শাফি বলেন,
“দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা গড়ে তোলাও আমাদের দায়িত্ব। বাঙালি মুসলমানের সুস্থ সংস্কৃতির সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষার কোনো বিরোধ নেই। বরং এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
এদিকে শিক্ষাসচিব মুফতি ফাহিম আল হাসান বলেন,
“শিক্ষার্থীদের বইয়ের গণ্ডির বাইরে এনে বাস্তব জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতেই আমাদের এই উদ্যোগ। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই আয়োজন করেছে—এটি তাদের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয়।”
পিঠা উৎসবে অংশ নেওয়া তওফিকুল ইসলাম নামের এক মাদরাসা শিক্ষক বলেন, “দারুন্নাজাত ক্বওমী মাদরাসার এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। সাধারণত কওমী মাদরাসায় এমন আয়োজন দেখা যায় না। আমি মনে করি, প্রতিটি মাদরাসায় এমন পিঠা উৎসব আয়োজন করা উচিত।”
শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শিকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন সময়োপযোগী বলে মনে করছেন উপস্থিত অতিথিরা। ভবিষ্যতেও দারুন্নাজাত ক্বওমী মাদরাসার পক্ষ থেকে আরও ব্যতিক্রমধর্মী ও শিক্ষণীয় আয়োজন অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশাই সকলের।

















