সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহর যেন ময়লার স্তূপ!

সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভার উদ্যোগহীনতায় দিন দিন পৌরশহরে বাড়ছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। নাগরিক সুবিধার অন্যতম মৌলিক চাহিদা—পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে যেখানে পৌর কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন, সেখানে দীর্ঘ ২৪ বছরেও গৃহীত হয়নি ময়লা অপসারণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ।
পৌরশহরে নেই ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান কিংবা পর্যাপ্ত ডাস্টবিন। একারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তার পাশে স্তূপ করে ময়লা ফেলছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে শহরের সৌন্দর্য্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান পারভেজ, সুধাসিন্ধু দাস, সুদীপ রায় বলেন, দিন দিন পৌরসভায় যেমন মানুষ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে ময়লা ফেলার জায়গার সংকটে নতুন নতুন স্থানে গড়ে উঠছে বর্জ্যের স্তূপ।
তারা বলেন, আগে যেসব ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় মানুষ ময়লা ফেলত, সেগুলো মাটি ভরাট করে এখন তৈরি করা হয়েছে বসতবাড়ি। প্রতিদিন গৃহস্থালি বর্জ্য, বাজারের উচ্ছিষ্ট এবং প্লাস্টিকসহ নানা ধরণের আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না পেয়ে রাস্তার পাশে স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে দিরাই পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। একপর্যায়ে ২০১৭ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে উন্নীত হয়। তবে নামেই দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভা। প্রায় ৬.৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় ৩০ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। এ পৌরসভায় প্রতিদিন গড়ে এক টনের চেয়েও বেশি বর্জ্য তৈরি হয়। অথচ এই বর্জ্য অপসারণে নেই আধুনিক কোনো ব্যবস্থা। অন্যদিকে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের মাস্টাররোলসহ পরিস্কার—পরিচ্ছন্ন কর্মী রয়েছে ২৪ জন। এরা নিয়মিত বাজারের প্রধান প্রধান সড়কগুলো পরিস্কার —পরিচ্ছন্ন রাখছেন। সাবেক মেয়র বিশ্বজিত রায়ের সময়েও বাজারে ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দোওজ এলাকার পৌরসভা কার্যালয়ে যাওয়ার সড়কের পাশে একই এলাকার জগন্নাথ জিউর মন্দির রোডের মন্দিরের পিছনে, শাওন নাগের বাড়ির সামনের রোডের পাশে, রামু রায়ের বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে, হরেন্দ্র বর্মনের বাড়ির রোডের পাশে ময়লার স্তূপ রয়েছে। আনোয়ারপুর—হারনপুর সড়কের পাশে কয়েক জায়গায় ময়লার স্তূপ। একই এলাকার জিতেষ রায়ের বাড়ির সামনে, কর্ণগাঁও পয়েন্টে আঞ্জলিক সড়কের পাশে, পুরাতন বাগবাড়ি এলাকার প্রাণী সম্পদ হাসপাতাল সংলগ্ন জায়গায়, গার্লস স্কুল রোডে কালনী নদীতে গোসল করার একমাত্র ঘাটটি ময়লার স্তূপ দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও মজলিশপুর এলাকার বিভিন্ন রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি ময়লার স্তূপ দেখতে পাওয়া যায়।
এসময় উপস্থিত স্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, পৌরসভার প্রায় সকল এলাকায় এরকম ময়লার স্তূপ দেখা যায়। নির্দিষ্ট কোন স্থান বা ডাস্টবিন না পেয়ে বাধ্য হয়ে এভাবে প্রতিদিন বর্জ্য স্তূপ করে রাখছেন নাগরিকরা। এগুলো অপসারণে পৌর কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ না নিলে দিন দিন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে বলে তারা জানান।
হাসপাতাল রোডের আব্দুল জাহির জানান, অনেকে আমার পুকুরেই ময়লা ফেলে। যদি পৌরসভা প্রতিদিন ময়লা নিয়ে যেত, তাহলে আমরা নিজেরাই সংগ্রহ করে রাখতাম। এমনকি মাস শেষে পরিচ্ছন্নকর্মীকে কিছু অর্থও দিতে পারতাম। আনোয়ারপুর এলাকার সনি দাস বলেন, এক সময় এলাকার মানুষ ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরে ময়লা— আবর্জনা ফেলত, এখন পুকুর ভরাট করে দোকান—ঘর তৈরি করা হয়েছে। সেজন্য স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে কালনী নদীর গোসলের ঘাটে ময়লা ফেলছে।
দোওজ এলাকার নিরুপম রায় নিঝুম বলেন, আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটিতে যে ময়লার স্তূপ দেখছেন এ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়, ভাড়াটিয়ারা এখানে ময়লা—আবর্জনা ফেলে থাকেন। গ্রীণ দিরাই সংগঠনের পরিবেশবাদী মো. ফারহানুল হক বলেন, আমি প্রথম থেকে দিরাই পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলে আসছি। পৌরসভায় এখানে সেখানে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশের ক্ষতিসহ পথচারী, স্কুলগামী শিশুদের স্বাস্থ্যেরহানি হচ্ছে। অনতিবিলম্বে দিরাই পৌরসভার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু সমাধান আশা করছি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শংকর চন্দ্র দাস জানান, বর্জ্য—আবর্জনার দুর্গন্ধের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয় হয়। এই পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন না হলে ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটতে পারে। পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ সূত্রধর বলেন, যদি এমন পরিস্থিতি হয়ে থাকে, তবে আমরা গুরুত্বসহকারে বিষয়টি বিবেচনা করব। জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন বসিয়ে নিয়মিত ময়লা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।























