মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম:

২০১৩ সালের ৫ই মে। রাতের আঁধারে আমার দেহ ছিল শাপলা চত্বরে। নির্মম আঘাতে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। শাপলা চত্বরে থাকা আমার দেহ পরে পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ের পাশ্ববর্তী এলাকায়। দুই স্থানের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার (শুনেছি)। শাপলা চত্বরে ছিলাম আমি, অথচ আমার দেহ পৌঁছালো নারায়ণগঞ্জে—এই প্রশ্ন আজও আমার মনে ঘুরপাক খায়। কোনো উত্তর পাই না।

দুজন দ্বীনি ভাই আমার অবস্থা বুঝতে পেরে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আল্লাহর রহমতে আমার মোবাইল ফোনটি পকেটে অক্ষত ছিল। তারা সেই মোবাইল থেকেই বিভিন্ন নম্বরে ফোন করে আমার পরিবারের কাছে খবর পৌঁছে দেন। কেউ বলেছে, আমি নাকি লাশের সারিতে ছিলাম। আবার কেউ বলেছে—ট্রাক ড্রাইভার ভালো মানুষ ছিল, আমার শরীরের নড়াচড়া টের পেয়ে আমাকে রাস্তার পাশে নামিয়ে দিয়ে গেছে।

সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর দয়ায় বাঁচিয়ে এনেছেন। শুকরান লাক, ইয়া রাব্বাল আলামীন। পরবর্তীতে ঢাকার সালাহউদ্দিন প্রাইভেট হাসপাতালে আমার মাথার অপারেশন হয়। অপারেশন করেন ডা. আব্দুল্লাহ আলমগীর স্যার। তাঁর কাছেই এখনও চিকিৎসা নিচ্ছি।

২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আমার চিকিৎসার পেছনে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন ৯৩ টাকার ওষুধ সেবন করতে হচ্ছে। (৬ মে ২০১৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চিকিৎসার সব ডাটা, ফাইলপত্র ও কাগজপত্র প্রমাণস্বরূপ সংরক্ষিত আছে।)

কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য হলো—সেই সময় বিভিন্ন মাধ্যমে অনুদান ও হেফাজত থেকে দেওয়া কিছু অর্থের কথা শুনেছি। তবে সেই টাকার সবটা আমার হাতে বা আমার পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি। মাঝপথে কে বা কারা আত্মসাৎ করেছে—আল্লাহই ভালো জানেন। এই অসুস্থতার কারণে আমি এখন প্রায় ঘরবন্দী। একা কোথাও যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জীবনটা হয়ে গেছে সীমাবদ্ধ, বন্দী এক বাস্তবতা।

অতঃপর…
আমার মতো আরও যারা আজও “জিন্দা জেলে” আছি, চারদিক থেকে হতাশায় নিমজ্জিত—তাদের কথা কে ভাববে? চিকিৎসার চাপ সামলাতে গিয়ে পরিবারগুলো ক্লান্ত, অতিষ্ঠ, অসহায়। দুঃখ বলার মতো কোনো অভিভাবক নেই। হেফাজতের মামলায় যাদের আজও নিয়মিত কোর্টে হাজিরা দিতে হয়—তাদের খোঁজ কে রাখে?

হেফাজত কি সত্যিই হেফাজত? অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা কি তারা রাখে? আমাদের খোঁজ রাখার কেউ নেই—এক আল্লাহ ছাড়া।

ফিলিস্তিনের সেই শিশুর মতো আমারও খুব ইচ্ছে করে বলতে—“আমি আল্লাহর কাছে সব বলে দিবো।”

যদিও বলার প্রয়োজন নেই। এই হৃদয় প্রতিদিন, প্রতিরাত ৫-৬ মে স্মরণ করে। অথচ সবাই বছরে একবার স্মরণ করে। আমরা (মাজলুম) আর তোমাদের মাঝে পার্থক্য শুধু এতটুকুই। ধান্ধাবাজ ক্ষমতালোভীরা ক্ষমতার লোভে আর্তচিৎকার করে। আর মাজলুমেরা নিশ্চুপ থেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে সহ্য করে যায়, দেখে যায়। ফ্যামিলি ও সমাজে তারা হয়ে যায় তাচ্ছিল্যের পাত্র।

সবর… সবর…সবর…!!!
এই শব্দগুলো আঁকড়ে ধরেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখি। মহান রব্বে কারীমের কাছে উত্তম জাযার প্রত্যাশী। তিনি তো আর ফিরিয়ে দেবেন না—ইনশাআল্লাহ। কঠোর ভাষা ব্যবহারের জন্য বড়দের কাছে বেয়াদবি হলে ক্ষমাপ্রার্থী।

লেখক: তরুণ আলেম, ব্যবসায়ী; সহযোগী সম্পাদক, মাসিক ছন্দপাতা