অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্রগুলোর অন্যতম পথিকৃৎ, ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা (বন্য পশুপাখি সেবাশ্রম)’–এর প্রতিষ্ঠাতা সীতেশ রঞ্জন দেব (সীতেশ বাবু) আর নেই। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে শ্রীমঙ্গলসহ দেশের প্রকৃতিপ্রেমী, পরিবেশকর্মী ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সীতেশ রঞ্জন দেব দীর্ঘদিন ধরে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর সেবা, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনে কাজ করে আসছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বন্য পশুপাখি সেবাশ্রম’ সাধারণ মানুষের কাছে ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামেই বেশি পরিচিত।

পারিবারিকভাবেই প্রাণিসেবার প্রতি তাঁর আগ্রহের শুরু। পিতা শ্রীশ দেবের অনুপ্রেরণায় ১৯৭১ সালে তিনি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গড়ে তোলেন বন্য পশুপাখি সেবাশ্রম। পরে এটি শ্রীমঙ্গল শহর থেকে রূপসপুর এলাকার খামারবাড়িতে স্থানান্তর করা হয়।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই সেবাশ্রমে আশ্রয় পেয়েছে হরিণ, ভালুক, হনুমান, অজগর, মেছোবাঘ, গুঁইসাপ, সজারু, ধনেশ, টিয়া, ময়না ও বিভিন্ন প্রজাতির বিরল পাখিসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী। চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠা অনেক প্রাণীকেই পরে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য সেবাশ্রমটি উন্মুক্ত থাকলেও সেখানে প্রবেশে কোনো ধরনের ফি নেওয়া হতো না।

সীতেশ বাবুর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৯১ সালে। আহত একটি বন্য ভালুকের আক্রমণে তাঁর মুখমণ্ডলের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও একাধিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে সেই দুর্ঘটনার জন্য তিনি কখনো প্রাণীকে দায়ী করেননি। বরং প্রায়ই বলতেন, “ভুলটা আমার ছিল, প্রাণীদের নয়।” ওই ঘটনার পরও তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সেবার কাজ থেকে সরে আসেননি।

প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁর নিবেদন শ্রীমঙ্গলের সীমানা ছাড়িয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেবাশ্রম অসংখ্য আহত ও বিপন্ন প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতিপ্রেম গড়ে তুলতেও প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ অবদান রেখেছে।

সীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। তাঁর আজীবনের অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নেরও দাবি জানিয়েছেন অনেকে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাঁরা এই নিবেদিতপ্রাণ প্রকৃতিপ্রেমীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।