আবু সুফিয়ান রায়হান

জীবনের কিছু রাত কখনো ভোলা যায় না। সময় যতই পেরিয়ে যাক, কিছু মুহূর্ত স্মৃতির ভাঁজে ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমার জীবনে গত জুলাইয়ের সেই রাতও তেমনই একটি রাত। আজও যখন চোখ বন্ধ করি, মনে হয় সবকিছু যেন আবারও ঘটছে। চারপাশের নীরবতা, বুকের ভেতরের অজানা অস্থিরতা, আর আল্লাহর ওপর এক অদ্ভুত নির্ভরতা—সবকিছু আজও ঠিক ততটাই জীবন্ত।

১৭ জুলাই। দেশের পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত। চারদিকে অস্থিরতা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেটওয়ার্ক বন্ধ, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের খবর একের পর এক ছড়িয়ে পড়ছিল। মানুষের চোখে ছিল উদ্বেগ, আর আমার অন্তরে জন্ম নিচ্ছিল এক গভীর উপলব্ধি—মানুষ যত শক্তিশালীই মনে করুক নিজেকে, শেষ ফয়সালা একমাত্র আল্লাহরই।

সেই অনুভূতি থেকেই গভীর রাতে আমি একটি লেখা প্রকাশ করি। সেখানে লিখেছিলাম, আল্লাহই একমাত্র মালিক, তিনিই সর্বোত্তম বিচারক। দুনিয়ার ক্ষমতা, পদ কিংবা প্রভাব—সবই ক্ষণস্থায়ী। একদিন মানুষকে একাই তার রবের সামনে দাঁড়াতে হবে।

লেখাটি প্রকাশ করার সময় কল্পনাও করিনি, মাত্র দুই ঘণ্টা পর আমার নিজের জীবনেই সেই কথাগুলোর পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে।

রাত তখন প্রায় দুইটা। হঠাৎ দরজায় শব্দ। পরিবারের সবার সামনে কোনো অপরাধ ছাড়াই আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। সেই মুহূর্তে ভয় ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল; কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অন্তরের গভীরে একটি বিশ্বাসও ছিল—আল্লাহ আমাকে দেখছেন। তিনি জানেন, আমি কেন এই পথের যাত্রী হয়েছি।

প্রায় আঠারো ঘণ্টা আমাকে আটক রাখা হয়েছিল। থানায় আমার মোবাইল ফোন নিয়ে দেখা হচ্ছিল আমার লেখা। কর্তব্যরত ওসি দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ পড়লেন। পরে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়েছিল, তিনি আমার লেখার মূল কথাটি বুঝতে পেরেছেন। ধর্মের পরিচয় ভিন্ন হলেও সত্যের ভাষা যে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে, সেদিন সেটিও নতুন করে উপলব্ধি করেছিলাম।

আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই দিনগুলো ছিল আমার ঈমানের এক কঠিন পরীক্ষা। তখন বুঝিনি কেন এমন হচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রশ্নের উত্তর যেন নিজে থেকেই সামনে চলে এসেছে।

মাত্র বিশ দিনের ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এলো। সেই সময় অসংখ্য মানুষ জুলুমের শিকার হয়েছেন, অনেক মা-বাবা সন্তান হারিয়েছেন, অনেকেই গভীর রাতে সিজদায় কেঁদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছেন। কত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, কত শহীদের রক্ত, কত আহত মানুষের আর্তনাদ—সব মিলিয়ে এক ইতিহাস রচিত হয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ তাঁর ফয়সালা কার্যকর করেন মানুষের মাধ্যমেই। মানুষ উসিলা হয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত তাঁরই। তাই যখন সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হলাম, তখন মনে হয়েছিল—আমি আল্লাহকে চোখে দেখিনি, কিন্তু তাঁর কুদরতের নিদর্শন খুব কাছ থেকে দেখেছি। অনুভব করেছি, মানুষের সব হিসাবের ওপরে আরেকটি হিসাব আছে; সব পরিকল্পনার ওপরে আরেকটি পরিকল্পনা আছে।

জুলাই আমাকে শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি দেয়নি; শিখিয়েছে, মানুষের ভরসা ভেঙে যেতে পারে, ক্ষমতা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা কখনো বৃথা যায় না। তিনি কখন, কীভাবে এবং কোন পথে তাঁর ফয়সালা বাস্তবায়ন করবেন—তা আমরা জানি না। কিন্তু তিনি যে তাঁর বান্দাদের দেখেন, তাদের কান্না শোনেন এবং সময় হলে ন্যায়বিচার করেন—এই বিশ্বাস আমার অন্তরে আগের চেয়ে আরও দৃঢ় হয়েছে।

আজও জুলাই এলে সেই রাতের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই পোস্ট, সেই গ্রেপ্তার, সেই অনিশ্চিত কয়েক ঘণ্টা এবং পরবর্তী দিনগুলোর প্রতিটি ঘটনা। তখন মনে হয়, জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা শুধু স্মৃতি নয়—সেগুলো ঈমানকে নতুন করে গড়ে তোলারও মাধ্যম।

আল্লাহকে আমরা দুনিয়ার চোখে দেখতে পারি না। কিন্তু তাঁর কুদরত, তাঁর রহমত, তাঁর সাহায্য এবং তাঁর ফয়সালার নিদর্শন আমাদের জীবনের নানা অধ্যায়ে ছড়িয়ে থাকে। জুলাইয়ের সেই দিনগুলো আমার কাছে তেমনই এক অধ্যায়—যা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, মানুষের নয়, চূড়ান্ত রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই।

লেখক: জুলাই আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাগরিক; পরিচালক, সুবহে সাদিক অনলাইন শপ